হতদরিদ্রের বরাদ্ধের ঘর নির্মাণ হচ্ছে ইউপি সদস্যের বাড়িতে

0
265

৬৫ বছরের জাহেরা খাতুন বয়সের ভারে এখন প্রায় নুয়ে পড়েছেন। ক্ষীণ শরীর,
চোখেও ঝাপসা দেখেন। তার স্বামী সিরাজ আলী মারা গেছেন প্রায় এক যুগ আগে। এক
চিলতে থাকার জায়গাটি ছাড়া আর কোনো জমি নেই তার। পাঁচ সন্তানের মধ্যে চার
মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে মতিউর রহমান (৪৮) মাছ ধরার পাশাপাশি
অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। মাকে দেখভাল করাসহ পাঁচ সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে
সংসার চালাতে হচ্ছে তাকে। এতে মতিউরকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। আট
সদস্যের ওই পরিবারটির থাকার জন্য একটি মাত্র ছোট জীর্ণ টিনের ঘর রয়েছে।
এবার সরকারিভাবে একটি পাকা ঘর বরাদ্দ পান জাহেরা খাতুন। কিন্তু উৎকোচের ৭০
হাজার টাকা না দিতে পারায় ঘরটি বর্তমানে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদেস্যের
(মেম্বার) বাড়িতে নির্মাণ হচ্ছে।

ঘটনাটি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের দক্ষিণ সুনই
গ্রামের। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। এ নিয়ে
রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরের দিকে জাহেরার ছেলে মতিউর রহমান জেলা প্রশাসক
বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এর আগে বুধবার (১২ মার্চ) কলমাকান্দা উপজেলা
নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর অভিযোগ করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০২০ অর্থ
বছরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় গৃহহীনদের
জন্য দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় কলমাকান্দায় ৩৭টি ঘর বরাদ্দ
দেয় সরকার। আধা পাকা প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় প্রায় তিন লাখ টাকা
করে। এর মধ্যে পোগলা ইউনিয়নের দক্ষিণ সুনই গ্রামের জাহেরা আক্তার, ফাতেমা
আক্তার ও বৈছাজুরি গ্রামের কাঞ্চন বালা বিশ্বাসের নামে তিনটি ঘর রয়েছে।
স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন
কর্মকর্তা (পিআইও) ঘরগুলো বাস্তবায়ন করার কথা।

কিন্তু গত এক মাস আগে দক্ষিণ সুনই গ্রামের জাহেরা খাতুন নামে বরাদ্দ
হওয়া ঘরটির নির্মাণ খরচ বাবদ ওই ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো.
মোফাজ্জল হোসেন হায়দার ৭০ হাজার টাকা উৎকোচ দাবি করেন। দরিদ্র জাহেরা টাকা
দিতে না পারায় তার নামের ওই ঘরটি সম্প্রতি ইউপি সদস্য মোফাজ্জল হোসেন নিজ
বাড়িতে নির্মাণ শুরু করেন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় জাহেরা ও তার ছেলে মতিউর রহমানসহ স্বজনদের হুমকি
ধমকি দিচ্ছেন মোফাজ্জল হোসেন হায়দার। এমনকি বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে
জাহেরা ও তার ছেলেকে বিভিন্ন মামলায় জড়ানোসহ মেরে ফেলার হুমকি দেন।
হতদরিদ্রের নামে ঘর জনপ্রতিনিধির বাড়িতে নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের
মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। এ ঘটনায় রোববার মতিউর রহমান জেলা প্রশাসকের
কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এর আগে স্থানীয় ইউএনও বরাবর অভিযোগ দেয়া হয়েছে।

জাহেরা খাতুন বলেন, আমি গরিব মানুষ, খেটেখুটে খাই। বয়স্ক ভাতাও পাই না।
আমার একটি মাত্র ছেলে মানুষের বাড়িতে কাজ করে আর মাছ ধরে সারাদিনে যা পায়
তা দিয়ে আট সদস্যের সংসার চালায়। ছোট এই ভাঙা ঘরটিতে সবাই মিলে থাকতে খুব
কষ্ট হয়। গরিব মানুষ বলেই প্রধানমন্ত্রী আমাকে ঘর দিয়েছেন।

তিনি বলেন, মেম্বার মোফাজ্জল হোসেন আমার কাছে ৭০ হাজার টাকা ঘুষ
চেয়েছেন। কিন্তু টাকা কোথা থেকে দেব। পরে তিনি (মেম্বার) বলেন আমার গাভীটি
বিক্রি করে তাকে টাকা জোগাড় করে দিতে। টাকা দিতে পারিনি বলে আমার ঘরটি
মেম্বার তার বাড়িতে নির্মাণ করছেন। আমি এর বিচার চাই।

Pic-Netrokona

জাহেরা খাতুনের ছেলে মতিউর রহমান বলেন, আমার মায়ের নামে ঘর মেম্বার কেন
তার বাড়িতে বানাচ্ছেন তা জানতে চাইলে তিনি আমাকে ও আমার চাচাতো ভাই
জাহাঙ্গীর আলমকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি ও প্রাণনাশের ভয় দেখাচ্ছেন। এরই
মধ্যে চাচাতো ভাই জাহাঙ্গীরের নামে চাঁদাবাজি মামলা দিয়েছেন।

রোববার (১৫ মার্চ) মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, জাহেরার
নামে বরাদ্দ হওয়া ওই ঘরটির নির্মাণ কাজ তার বাড়ির টিনের একটি বড় দোতলা ঘরের
পাশে চলছে। ইটের গাঁথুনি ভিট পর্যন্ত করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ইট, বালু ও
সিমেন্ট এনে পাশে রাখা হয়েছে। তবে ওই দিন নির্মাণ শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা
যায়নি। মোফাজ্জলের বাড়ি থেকে জাহেরার বাড়ি অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, ঘুষের টাকা না দেয়ায়
হতদরিদ্র জাহেরার ঘরটি নিজের বাড়িতে বানানোর কাজটি ঠিক করেননি মেম্বার।
বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। একজন জনপ্রতিনিধির কাছে এ রকম কাজ কখনো কাম্য নয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোফাজ্জল হোসেন হায়দার বলেন, ঘরটি আমার বাড়িতেই
উঠানো হচ্ছে। তবে যেখানে ঘর উঠানো হচ্ছে সেই জায়গাটাটি প্রায় ১২ বছর আগে
জাহেরার ছেলে মতিউর রহমানের কাছ থেকে কিনেছিলাম। এখন চাইলে তার বাড়িতে ঘর
তুলে দেব। আর ৭০ হাজার টাকা চাওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়।

পোগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলামের মুঠোফোন বন্ধ থাকায়
এ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও তাকে পাওয়া
যায়নি।

কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সোহেল রানা বলেন, এ
বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে বলা
হয়েছে ঘরটির নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়ার জন্য। একই সঙ্গে ওই উপকারভোগীর
বাড়িতে ঘর নির্মাণের নিদের্শ দেয়া হয়েছে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন
দাখিল করতে স্থানীয় ইউএনওকে বলা হয়েছে। এ রকম হলে ওই ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে
আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here