সুন্দরবন বাঁচাও, বুলবুলই শেষ ঝড় নয়

0
364

মোংলা প্রতিনিধিঃ যতবার কোন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ, ততবারই অতন্দ্র প্রহরীর মতো বুক পেতে দিয়েছে সুন্দরবন। ঘুর্ণিঝড় বুলবুলও শুরুতে বেশ প্রতাপ দেখিয়েই প্রবেশ করেছিল বাংলাদেশে। কিন্তু সুন্দরবন আর উপকূল অঞ্চলের গাছের কারণে বুলবুল অতোটা ক্ষয়ক্ষতি করতে পারেনি। শুধু বুলবুলই নয় অতীতে আরো অনেক ঝড়ের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছিল এই সুন্দরবন। অথচ এই সুন্দরবন রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা উদাসীন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গত কয়েক বছরে ঘূর্ণিঝড়সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন অবস্থায় সুন্দরবনকে সংরক্ষণ করা না গেলে বিলীন হয়ে যেতে পারে দেশের দক্ষিণাঞ্চল। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, অতি প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ বঙ্গোপসাগর দিয়ে মূলত বাংলাদেশের স্থলভাগে প্রবেশ করেছে। এ সময় ঘূর্ণিঝড়ের একপাশে ছিল পশ্চিমবঙ্গ আর তিন পাশে ছিল সুন্দরবন। বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন অতিক্রম করতে ঘূর্ণিঝড়ের দীর্ঘসময় লাগে ও গতি কমে আসে। ফলে পূর্ণ শক্তি নিয়ে বুলবুল বাংলাদেশের স্থলভাগে আঘাত করতে পারেনি। এতেই বেঁচে গেছেন উপকূল অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ।

আবহাওয়াবিদ
আব্দুল মান্নান জানান, বুলবুল যে গতিতে আঘাত হানার কথা ছিল, সেই গতিতে
আসেনি। ঘূর্ণিঝড় জলভাগের ওপর দিয়ে চললে ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করতে পারে। কিন্তু
স্থলভাগে চললে হাজারো গাছ, বিভিন্ন স্থাপনার কারণে ঘূর্ণিঝড় বাধা প্রাপ্ত
হয় এবং গতি আস্তে আস্তে কমে যায়। আতঙ্ক ছড়ানো ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তিন দিকেই
ছিল সুন্দরবন। যেহেতু ঘূর্ণিঝড় উত্তর দিকে ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছিল, তাই
সুন্দরবনের কারণে বুলবুলের অবস্থানের পরিবর্তন কমে এসেছে। পাশাপাশি
প্রকৃতির এই রক্ষাকবচের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের নিজস্ব শক্তিও কমে যায়। আর
সুন্দরবনের প্রতিরোধের কারণে উপকূল অতিক্রম করতে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের দীর্ঘ সময়
লাগে। সুন্দরবন বাদে বরিশাল অংশ দিয়ে বুলবুল প্রবেশ করলে বাতাসে গতি হতো
১১৫ থেকে ১২০ কিলোমিটার বা তার চাইতেও বেশি। এতে বিশাল ক্ষতির মুখে পরতো
উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ।

বিভিন্ন
প্রাকৃতিক দুযোর্গ থেকে সুন্দরবন বার বার বাংলাদেশকে রক্ষা করলেও বিশ্বের
বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বনের পাশে গড়ে উঠছে বিভিন্ন কলকারখানা ও তাপ বিদ্যুৎ
কেন্দ্র। ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের
মধ্যে অনুমোদিত ১৯০টি ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করেছে পরিবেশ
অধিদপ্তর। এর মধ্যে ২৪টি প্রকল্প মারাত্মক দূষণকারী ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত।

পরিবেশবিদরা
বলছেন, সুন্দরবন এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ যেটা কোন কারণে ধ্বংস হলে সেটি
আর আমরা তৈরি করতে পারব না। এই বন বাংলাদেশকে মায়ের মতো আগলে রাখে।
বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৈব-দুর্বিপাক থেকে আমাদের রক্ষা করে। কিন্তু মাকে হত্যা
করার যে নানা আয়োজন সুন্দরবনের চারপাশে চলছে সেটি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ
নেয়া হচ্ছে না। সুন্দরবন রক্ষায় ভারত নিজের দেশে ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোন
কারখানা করতে দেয় না। কিন্তু আমাদের দেশে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে অসংখ্য
কল-কারখানা গড়ে উঠেছে।

বুলবুলের
প্রভাব কমে যাওয়ার পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো.
এনামুর রহমান বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবনই বারবার আমাদের
রক্ষা করছে। সুন্দরবনের প্রতি কেউ যেন অযত্ন-অবহেলা করতে না পারে, সে জন্য
সংশ্লিষ্ট মহলকে উদ্যোগ নিতে বলবো। সুন্দরবনের যেন আরও যত্ন নেয়া হয়, নতুন
নতুন গাছ লাগিয়ে বনকে শক্তিশালী করা হয়। সরকারের উচ্চ মহলের এমন বক্তব্য
অবশ্যই আমাদের আশার আলো দেখায়।

চারদিকে
যখন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ খ্যাত সুন্দরবন ধ্বংসের নানা আয়োজন তখন
প্রবল শক্তিশালী ঘুর্ণিঝড় বুলবুলকে ঠেকিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম এই
ম্যানগ্রোভবন যেন এক ধরনের বার্তাই দিয়ে গেল। নিজের বুক পেতে দিয়ে
বাংলাদেশকে রক্ষাকালে দেশবাসীর কানে কানে সুন্দরবন যেন বলে গেল, এবারের মতো
বাঁচিয়ে দিলাম। এখনি আমাকে রক্ষায় সোচ্চার হও। মনে রেখো, বুলবুলই শেষ ঝড়
নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here