মেশিনেও ভোট ডাকাতির ছাপ

0
293

চীফ রিপোর্টারঃ ব্যালটের ছায়ায়ই মেশিনে ভোট হলো ঢাকায়। ব্যালট না থাকলেও আগের ভোটগুলোর মতো কেন্দ্রে এক পক্ষের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষের লোকজনকে কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। আগে যেখানে ব্যালট ছিনতাই বা দখলে নিয়ে ভোটার দেয়ার নজির ছিল মেশিনেও এমনটি হয়েছে। তবে এই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে খোদ ভোটারের সামনে। নিজের ভোটটি নিজের সামনেই ছিনতাই হওয়ার বেদনা নিয়ে কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরেছেন অনেক ভোটার। তবে এতো নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও ভোটের হার নিয়ে হতাশা সর্বত্র। রাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা জানিয়েছেন, ভোটের হার ৩০ শতাংশের কম হবে। কমিশনার মাহবুব তালুকদার জানিয়েছেন প্রাপ্ত হিসেবে ভোটের হার ২৫ শতাংশের কম।

ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থী ও কর্মী সমর্থকদের দিনভর সরব
উপস্থিতির পরও ভোটের হার এতো কম হওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন সর্বত্র। অনেকে
বলছেন, এতো শোডাউনের পর সেই ভোটাররা তাহলে গেলেন কোথায়? ভোটের এই হাল নিয়ে
নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্টরা হয়তো তাদের ব্যাখ্যা দেবেন। তবে কমিশনার
মাহবুব তালুকদার অবশ্য বলেছেন, ভোট কম হলেও শতভাগ ভোট পড়া ও রাতের ভোট থেকে
নিস্কৃতি পেয়েছে নির্বাচন কমিশন। এটি তাদের জন্য সন্তুষ্টির বিষয়। এদিকে
এক পক্ষের আধিপত্য থাকলেও বিভিন্ন এলাকায় হামলা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
দায়িত্ব পালনের সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় রক্তাক্ত হয়েছেন কয়েকজন
সংবাদকর্মী। ঢাকা সিটির ভোটের আগে বলা হচ্ছিল অতীতের পুনরাবৃত্তিগুলো হবে
না এ ভোটে। ইভিএমে ভোট চুরির সুযোগ নেই। কিন্তু কোন প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা
মিলেনি। ভোটারদের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে। পরে
তাদের ভোটটি দেয়া হয়েছে নির্ধারিত প্রতীকে। কোন কোন ক্ষেত্রে ভোট প্রদানের
গোপন কক্ষে ভোটারদের সঙ্গী হয়েছেন প্রভাবশালী প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকরা।
তারা ভোটারদের নির্ধারিত প্রতীকে ভোট প্রয়োগে বাধ্য করেন। বিরোধী
প্রার্থীকে ভোট দেয়ায় মারধরের শিকার হয়েছেন এমন অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে
ভোটের মাঠে। দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষকদেরও খুব একটা দেখা যায়নি ভোটের মাঠে।
এদিকে ভোটের পূর্ণাঙ্গ ফল ঘোষণার আগেই রাতে বিরোধী বিএনপির পক্ষ থেকে
নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে হরতালের ডাক দেয়া হয়েছে। আজ রাজধানীতে সকাল
সন্ধ্যা এ হরতাল পালনের কথা জানিয়েছে দলটি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ভোটের ফলে
সন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে, বিগত ১০০ বছরের মধ্যে ঢাকায় ভালো ভোট হয়েছে।

হামলা-সংঘর্ষ:
দিনভর বিক্ষিপ্ত হামলা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে। দুই সিটিতে বিএনপি
সমর্থিত কাউন্সিলর ও তাদের এজেন্টদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায়
মারাত্বকভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকে। এছাড়া অনেক স্থানে
আওয়ামী লীগ-বিএনপি, বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। দক্ষিণ সিটির
১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাঠালবাগান খান হাসান আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের
বিএনপি সমর্থিত মেয়রের এজেন্ট ও কাউন্সিলর প্রার্থীর ওপর হামলা করেন
আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকরা। হামলায় বিএনপি মনোনীত কাউন্সিলর
প্রার্থী সিরাজুল ইসলামসহ ১০জন আহত হন। আহতদের হলি ফ্যামেলি ও ঢাকা মেডিকেল
কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দক্ষিণ সিটির ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদ জিয়া
বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আবুল কালাম অনুর
ভাগ্নের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী একে এম ফজলুল হকের
সমর্থকরা। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মীর আশরাফ
আলী আজম ও তার এজেন্টদের ওপর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ হামলা করে। এতে আশরাফ
আলী আজম, তার ভাই মীর সরাফত আলী সফু, মীর নেওয়াজ আলীসহ অনেকে আহত হয়েছেন।
দক্ষিণ সিটির ৪০ নং ওয়ার্ডের বাগানবাড়ি কেন্দ্রে মকবুল ইসলাম টিপু ও
বিএনপির এজেন্টদের ওপর হামলা করা হয়। মগবাজারে ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক
কাউন্সিলর মুন্সি কামরুজ্জামান কাজল ও তার ছেলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এই
হামলায় কাজল মারাত্বকভাবে আহত হন। সন্ধ্যায় নয়া পল্টনে আওয়ামী লীগ বিএনপির
মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এদিকে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে টিকাটুলী শহীদ নবী
স্কুলে নিউজ পোর্টাল পরিবর্তন ডট কমের ফটো সাংবাদিক ওসমান আলীর ওপর হামলা
করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায়  নিকুঞ্জে জানে আলম স্কুল কেন্দ্রে বার্তা
সর্ংস্থা পিবিএ এর বিশেষ প্রতিনিধি জিহাদ ইকবালকে পিটিয়ে জখম করা হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হসাপাতালে ভর্তি করা হয়।
মোহাম্মদপুরের জাফরাবাদে আগামি নিউজ ডট কমের রিপোর্টার মোস্তাফিজুর রহমান
সুমনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে চিকিৎসার জন্য শিকদার
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া গেণ্ডারিয়ার ফরিদাবাদ
মাদ্রাসায় বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার রিপোর্টার নুরুল আমিন ও বাংলাদেশ
প্রতিদিনের রিপোর্টার মাহবুব মমতাজীকে হেনস্থা করেন গেণ্ডারিয়া ছাত্রলীগের
সাবেক এক নেতা। ওই নেতা কেন্দ্র দখল করে রেখেছেন এমন সংবাদ পেয়ে তথ্য
সংগ্রহ করতে গেলে তিনি এই রিপোর্টারদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। পুলিশের
সহযোগিতায় দেড় ঘণ্টা পরে মোবাইলের সমস্ত তথ্য মুছে তিনি মোবাইল ফেরত দেন।
তেজগাঁও ও আগারগাঁও এলাকায়ও দায়িত্ব পালনের সময় হেনস্তার শিকার হন কয়েকজন
সাংবাদিক।

ভোটের মাঠে এক পক্ষ ব্যতিত অন্য কাউকে দেখা যায়নি-মাহবুব তালুকদার: 
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির নির্বাচনে ২৫ শতাংশের নিচে ভোট পড়েছে বলে
জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। শনিবার রাত সাড়ে সাতটায় লিখিত
বক্তব্যে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান। বলেন, কয়েকজন সাংবাদিক নির্বাচনী
পরিবেশের কথা আমার কাছে জানতে চেয়েছেন। আমি তাদের বলেছি নির্বাচনী পরিবেশ
সম্পর্কে তারা আমার চেয়ে বেশি অবহিত। কারণ তারা নিজের  চোখে সব দেখেছেন।
আমি মগবাজারস্থ ইস্পাহানী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কেন্দ্রে বেলা সাড়ে
১১টায় ভোট দিয়েছি। কেন্দ্রের সাংবাদিকগণ আমাকে জানান, সকালে বিরোধী দলের 
মেয়র প্রার্থীর এজেন্ট ছিলেন। তাদেরকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের এই অভিযযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। এছাড়া আনারস
প্রতীকের মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী আমাকে জানিয়েছেন, তার নির্বাচন এজেন্টকে
কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। আমি তাকে লিখিত অভিযোগ জানাতে বলেছি।
মাহবুব তালুকদার বলেন, আমি সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল ২টা পর্যন্ত মোট ১২টি
কেন্দ্র্র পরিদর্শন করি। এই ১২টি কেন্দ্রে আমি সরকারি দল সমর্থিত মেয়র
প্রার্থী ছাড়া আর কোন মেয়র প্রার্থীর এজেন্ট দেখতে পাইনি। তিনি আরও বলেন,
নির্বাচনে তফসিল  ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের যে দৃশ্য দেখা
গেছে, তাতে আমি মর্মাহত। আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে আচরণবিধি
থাকা না থাকায় কোন পার্থক্য থাকে না।

তিনি বলেন, ইভিএম ব্যবহার করে
এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে এতে কোন কেন্দ্রে শতকরা ১০০ শতাংশ ভোট
পড়েনি। নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার সুযোগ ছিল না। রাতে
ব্যালট পেপারে বাক্স ভর্তি ও কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার অপবাদ থেকে আমরা
মুক্ত। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত
২৫ শতাংশের নিচে ভোট পড়েছে। নির্বাচন খুবই শান্তিপূর্ণ হয়েছে উল্লেখ করে
তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া কোন মারামারি বা রক্তক্ষয় হয়নি। ভোটের
মাঠে এক পক্ষ ব্যতীত অন্য পক্ষগুলোকে দেখা যায়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here